বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশে প্রায় শতকরা ৮৫ ভাগ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত। কৃষিতে যে কৃষিতে ঘিরে জড়িত হয়েছে এদেশের জীবনপ্রণালি। নদীর সাথে আমাদের কৃষির সম্পর্ক অতি গভীর। মাটি উর্বর করতে নদীর প্রভাব অপরিহার্য্য। মাটি উর্বর শক্তি সুস্থিতিতে নদীর ভূমিকা অপরিসীম। নদীর পলিমাটির প্রয়োজন হয়। তার অধিকাংশই আসে নদী থেকে। মাটির উর্বর শক্তি সুস্থিতিতে পলিমাটির ভূমিকা অপরিসীম। নদীর পলিমাটি আমাদের জমিতে প্রভাবিত হয় তখন তা ব’য়ে নিয়ে আসে প্রচুর পলিমাটি। এ পলিমাটি আমাদের দেশের উর্বরতা বৃদ্ধি করে। তাই আমাদের দেশে নদী সৃষ্ট যে বন্যা দেখা দেয় তা অনেক সময় অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দেয়।
শুধু কৃষিকাজই নয়; নদীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আরও অনেক পেশা। আমাদের দেশে এক সময় মাঝির শব্দের ব্যবহার ছিল বহুল প্রচলিত। মাঝিরা ছিল নদীগুলোর প্রাণ। দিবারাত্রি নদীগুলোতে চলত মাঝিদের পদচারণা। সকাল সন্ধ্যায় তাদের হাঁকডাকিতে মুখরিত হতো শহর-বন্দরগুলো। মাঝিরা পাল তোলা নৌকা নিয়ে ছুটে চলত এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে। তাদের কর্মপ্রবাহের ফলে দেশের সকল স্থানে পণ্য সরবরাহের কাজটি সম্পন্ন হতো। সুচারুরূপে।
আমাদের দেশের নদীকে ঘিরে রয়েছে শত শত মৎস্য জেলে তাদের পরিবার। বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো হচ্ছে মৎস্য সম্পদের অফুরন্ত ভাণ্ডার। সারা বছর আমাদের দেশের জেলেরা নদীতে মাছ ধরে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শত শত মৎস্য জেলে পল্লি। এ সব জেলে পল্লি দিবারাত্রি সরগরম থাকে জেলেদের পদচারণায়। জেলেরা দিবারাত্রি মাছ ধরে আমাদের দেশের মানুষের দৈনন্দিন আমিষের প্রয়োজন মেটায়। এমন কী আমাদের দেশের জেলেদের আহরিত মৎস্য সম্পদ বিদেশে রপ্তানি করেও আমরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করি।
নদীর আরেকটি রূপ হলো চরাঞ্চল। আমাদের দেশের প্রায় সকল নদীতেই রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় চর। এ সবের আয়তন ১-২ বর্গ কিলোমিটার থেকে হাজার বর্গ কিলোমিটার রয়েছে। বাংলাদেশের ভোলা জেলার সবচেয়ে আয়তন ৩৮০০.৪৮ বর্গ কি.মি। এটি মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় অবস্থিত। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এ জেলার অবস্থান বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ভোলা জেলা চরাঞ্চল হলেও এখানকার জীবনযাত্রা বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার মতোই জাঁকজমকপূর্ণ। এ ছাড়াও বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নদীকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য চর। এ সব চরে বসবাস পিরি এ সব চরাঞ্চলগুলো দুর্গম এলাকা হিসেবে বিবেচিত। এখানে মূল ভূ-খণ্ডের মতো জনজীবনে স্বাচ্ছন্দ্যতা নেই। এখানে নেই উন্নত রাস্তাঘাট, বৈদ্যুতিক বাতি, স্কুল-কলেজসহ অন্যান্য আধুনিক জীবনের উপকরণ। এখানকার অধিবাসীরা খুবই অবহেলিত ও লাঞ্ছিত। কেউ এদের পাশে এসে দাঁড়ায় না। ফলে চরাঞ্চলের মানুষ ও তাদের সন্তানরা এক অনাগত ভবিষ্যতের দিকে ছুটে চলে যার বাস্তবতা তারা জানে না।
আবার নদী অধ্যুষিত এলাকার লোকের যাতায়াতের প্রধান বাহন হলো নৌকা। ফলে নদী এলাকার লোকেরা নৌকা চালনায় যেমন দক্ষতা প্রদর্শন করে আসছে; তেমনি নৌকা তৈরিতেও তাদের রয়েছে অসাধারণ দক্ষতা। বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পীর রঙতুলিতেও স্থান পেয়েছে পাল তুলে ছুটে চলা নৌকার দৃশ্য। এ সব প্রাকৃতিক দৃশ্য আমাদের দেশের কবি সাহিত্যিক ও শিল্পীর কর্মে উৎসাহিত করেছে। বাংলা বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের নৌকার সমাহারও আমাদেরকে বিমুগ্ধ করে। পানসি, বজরা, কোষ, সাম্পান ইত্যাদি বিচিত্র ধরনের নৌকা প্রাচীনকাল থেকে আমাদের দেশে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রাচীনকাল থেকেই যে আমাদের দেশের নৌকার ব্যবহার ছিল তা প্রাচীন জ্ঞানীদের লেখা থেকেও আমরা জানতে পারি। ঐতিহাসিক আবুল ফজল লিখেছেন, "বাঙালিরা বিভিন্ন প্রকারের নৌকা যুদ্ধের কাজে এবং পরিবহনের জন্য ব্যবহার করে। দুর্গ আক্রমণের সৈন্যদের পক্ষে সুবিধা হয়।" আবার প্রাচীন কালে রাজা-বাদশাহগণ নদীগুলোকে প্রতিরক্ষা ব্যূহ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বাংলার বার ভূঁইয়াদের অন্যতম ঈসা খাঁ সোনারগাঁয়ে যে রাজধানী স্থাপন করেছিলেন তার কারণ ছিল সোনারগাঁয়ের চতুর্দিক নদী, সহজে নদী পাড়ি দিয়ে সোনারগাঁকে আক্রমণ করতে না পারে সেজন্য তিনি এখানে রাজধানী সৃষ্টি করেছিলেন বলে ঐতিহাসিকদের ধারণা।
সাহিত্যের ক্ষেত্রেও নদ-নদীর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। কবিকুল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিল্পী এস এম সুলতান ও অন্যান্য কবি ও গুণী শিল্পীরা নৌকায় বসে সাহিত্য ও শিল্প চর্চা করেছেন। আমাদের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনও নদীর তীরে বসে ছবি আঁকতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।