প্রাচীন বঙ্গ রাষ্ট্রের সীমানা রেখা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে নির্ধারিত হলেও এর মূল ধারায় তেমন কোনাে পরিবর্তন আসে। নি। মােগল সম্রাট আকবর এর সভাসদ আবুল ফজল রচিত আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে বলেছেন, বাঙালা পূর্ব-পশ্চিমে অর্থাৎ | চট্টগ্রাম থেকে তেলিয়াগড় পর্যন্ত ৪০০ ক্রোশ এবং উত্তর-দক্ষিণে অর্থাৎ উত্তরে পাহাড়ী এলাকা থেকে হুগলীর গড় মান্দারণ পর্যন্ত ২০০ ক্রোশ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল মিলে সুবা বাংলা বা বাংলা প্রদেশ ধরা হতাে। এই সুবা পূর্বে ও উত্তরে পর্বত বেষ্টিত এবং দক্ষিণে সমুদ্র বেষ্টিত ছিল। এর পশ্চিমে সুবা বিহার। কামরূপ ও আসাম সুবা বাঙালার সীমান্তে অবস্থিত ছিল। আবুল ফজল বাঙালাহ নামের উৎপত্তি সম্পর্কে দেখিয়েছেন যে, এদেশের প্রাচীন নাম ছিল বঙ্গ। প্রাচীনকালে এখানকার নৃপতিগণ ১০ গজ উচু ও ২০ গজ বিস্তৃত প্রকাণ্ড আল বা বাধ নির্মাণ করতেন। বঙ্গ শব্দের সাথে আল’ যােগ হয়ে বঙ্গাল বা বাঙালা শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়।
প্রাচীন বঙ্গ রাজ্যের সীমানার উত্তরে রয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদ। ব্ৰহ্মপুত্র নদের দ্বারা প্রাচীন কালে পূর্ব ও পশ্চিম সীমা নির্দেশ করা হতাে। এ ছাড়া বাংলার পূর্বে রয়েছে সিকিম ও হিমালয়ের জলপাইগুড়ি জেলা। বাংলার পূর্বে রয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদ, লুসাই পাহাড়, খাসিয়া ও জৈয়ন্তিয়া ভাগীরথী ও করতােয়া এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই সমগ্র এলাকা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত।
উপরােক্ত বর্ণনা ছাড়াও আরাে অনেক ঐতিহাসিক ও লেখকের লেখনীতে প্রাচীন বাংলার সীমানা সম্পর্কে জানা যায়।নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙালির ইতিহাস: আদিপর্ব' নামক গ্রন্থেও প্রাচীন বাংলার সীমানা সম্পর্কে জানা সম্ভব হয়। তিনি বাংলার সীমানা বর্ণনা করেছেন এভাবে-“উত্তরে হিমালয় এবং হিমালয় ধৃত নেপাল, সিকিম ও ভূটান রাজ্য; উত্তর পূর্ব দিকে ব্রহ্মপুত্র নদ ও উপত্যকা; উত্তর। পশ্চিম দিকে দ্বারভঙ্গ পর্যন্ত ভাগীরথীর উত্তর সমান্তরালবর্তী সমভূম; পূর্ব দিকে গারাে-খাসিয়া-জৈয়ন্তিয়া-ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম। শৈলশ্রেণি বাহিয়া দক্ষিণে সমুদ্র পর্যন্ত; পশ্চিমে রাজমহল, সাওতাল পরগণা-ছােট নাগপুর- মানভূম-ধলভূম-কেওঞ্জরময়ূরভঞ্জের শৈলময় আরণ্যময় মালভূমি; দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই প্রাকৃতিক সীমাবিধৃত ভূমিখণ্ডের মধ্যেই প্রাচীন বাংলার গৌড়-পু-বরেন্দ্রী-রাঢ়-সূহ্ম-তাম্রলিপি-সমতট-বঙ্গ-বঙাল-হরিকেল প্রভৃতি জনপদ; ভাগীরথী-করতােয়া-ব্রহ্মপুত্র-পদ্মা-মেঘনা এবং আরও অসংখ্য নদ-নদী বিধৌত বাংলার গ্রাম, প্রান্তর, পাহাড়, কাণ্ডার। এই ভূখণ্ডই ঐতিহাসিককালের বাঙালির কর্মকৃতির উৎস এবং ধর্ম-কর্ম-নর্মভূমি। একদিকে সুউচ্চ পর্বত, দুইদিকে কঠিন শৈলভূমি, আর এক দিকে বিস্তীর্ণ সমুদ্র; মাঝখানে সমভূমির সাম্য-এটাই বাঙালির ভৌগােলিক ভাগ্য।”
