Welcome to Business Studies, your number one source for learning.-----We're dedicated to providing you the best of learning information and knowing new things , with a focus on dependability.----- We're working to turn our passion for learning information into a booming online platform.----- We hope you enjoy our sites as much as we enjoy offering them to you.----- Sincerely,Masud Parvez

প্রাচীন জনপদ এবং বাংলার শহর এর উৎপত্তির ইতিহাস।



প্রাচীনকালে সমগ্র বাংলার কোনো একক ও অখণ্ড রাষ্ট্র বা রাজ্য ছিল না ।বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল তখন বিভিন্ন জনপদে বিভক্ত ছিল। এসব জনপদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলাে বঙ্গ, পুন্ড্র, গৌড়, বরেন্দ্র, রাঢ়, সুহ্ম, সমতল, হরিকেল, চন্দ্রদ্বীপ, তাম্রলিপি, বজ্রভূমি প্রভৃতি বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। বাংলার প্রাচীন জনপদগুলাের সীমানা ও বিস্তৃতি সঠিকভাবে নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়। কেননা বিভিন্ন সময়ে এসব জনপদের সীমানা হ্রাস বা বৃদ্ধি ঘটেছে। এসব জনপদের পৃথক পরিচয় সম্পর্কে সুভাষ মুখােপাধ্যায় লিখেছেন, “এদের ছিল আলাদা আলাদা রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের দাপট যেমন বেড়েছে এবং কমেছে, সঙ্গে সঙ্গে জনপদের সীমানাও। তেমনই বেড়েছে এবং কমেছে। এসব জনপদ ঠিক কোথায় কতখানি জায়গা জুড়ে ছিল, তা বলা যায় না। তবে বিভিন্ন তা | পুঁথিতে যেসব উল্লেখ পাওয়া যায়, তা থেকে তাদের বিস্তার সম্বন্ধে মােটামুটি কিছু আঁচ পাওয়া যায়। নিম্নে প্রাচীন বাংলার জনপদসমূহের পরিচিতি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলাে :

১.বঙ্গ : বাংলাদেশের একটি প্রাচীনতম জনপদের নাম বঙ্গ। ঋগ্বেদের “ঐতরেয় আরণ্যক” গ্রন্থে, সবপ্রথম বঙ্গ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাছাড়া বৌধায়ন ধর্মসূত্র, পুরাণ, রামায়ণ এবং মহাভারতে “বঙ্গ” নামের উল্লেখ আছে। এতে বােঝা ভারতীয় উপমহাদেশে আর্যদের আগমনের বহু পূর্ব থেকেই বঙ্গ নামক জনপদের অস্তিত্ব ছিল। রামায়ণে অযোধ্যার সাথে মিত্রতা স্থাপনকী দেশের তালিকায় বঙ্গ’ এর উল্লেখ রয়েছে। সাধারণত বঙ্গ রাজ্যের সীমারেখা ছিল পশ্চিমে ভাগীরথী, উত্তরে গঙ্গা, পূর্বে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। সুতরাং এ কথা বলা যায় গঙ্গার দুটি শাখা নদী ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যবর্তী অঞ্চল বঙ্গ নামে পরিচিত ছিল। পাল রাজাদের শাসনামলে বঙ্গ দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যথা : উত্তর বঙ্গ এবং দক্ষিণ বঙ্গ। প্রাচীন শিলালিপি থেকে বঙ্গের দুটি অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়। যথা— বিক্রমপুর এবং নব্যমণ্ডল। বর্তমান বিক্রমপুর পরগনা ও তার সাথে আধুনিক ইদিলপুর পরগনার কিছু অংশ নিয়ে বিক্রমপুর ভাগ গঠিত ছিল। বর্তমান বরিশাল জেলা ও আরাে পূর্ব দিকে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের নাম ছিল নব্যমণ্ডল। ঐতিহাসিক মিনহাজউদ্দীন সিরাজ ভাগীরথীর পূর্বতীরে বর্তমান বাংলাদেশের পূর্ব দক্ষিণ অঞ্চলকেই বঙ্গ নামে অভিহিত করেছেন। এ অঞ্চলটি গিয়াসউদ্দিন বলবনের শাসনামলে মুসলমানদের কাছে “বাঙ্গালাহ” নামে পরিচিত হয়। মিনহাজের পরে জাবেক ৯তহাসিক জিয়াউদ্দিন বারনি তার “তারিখ-ই-ফিরােজশাহী” নামক গ্রন্থে “বাঙলা” নামটি ব্যবহার করেন। তবে তিনি বাঙলাকে সমগ্র দেশ হিসেবে উল্লেখ করেননি। জিয়াউদ্দিন বারনির পরবর্তী ঐতিহাসিক শামস-ই সিরাজ বাংলার শাসক সুলতান শামস উদ্দীন ইলিয়াস শাহকে শাহ-ই-বাঙলা বা সুলতান ই-বাঙলা আখ্যা দিয়েছেন। 

২. পুন্ড্র : উত্তর বঙ্গে পুন্ড্র জনগােষ্ঠীর আবাসস্থল পুন্ড্র বা পুন্ড্রবর্ধননামে পরিচিত ছিল। পুন্ড্র শব্দের অর্থ হচ্ছে কষিজীবী।পুন্ডগণ শাক-সবজি ও আখের চাষ করত। পুন্ড্র-এর কেন্দ্র স্থল বর্তমানে বগুড়ার মহাস্থানগড়ে অবস্থিত। বৈদিক গ্রন্থে, “রামায়ণ এবং মহাভারতে পুন্ড্র নামে এক প্রাচীন জাতির নাম উল্লেখ আছে। মহাভারতের দিগ্বিজয় পর্বে বলা হয়েছে যে। গঙ্গা নদীর পূর্বভাগে পুন্ড্রদের রাজ্য বিস্তৃত ছিল। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার এর মতে, পুন্ড্র একটি প্রাচীন জাতিগােষ্ঠীর নাম। এরা উত্তর বঙ্গে বাস করত বলে এই অঞ্চল পুন্ড্রদেশ বা পুন্ড্রবর্ধন নামে খ্যাত ছিল। “পঞ্চম ও ষ্ষ্ঠ শতকে পুন্ড্রবর্ধন ভুক্ত বগুড়া, দিনাজপুর এবং রাজশাহী জেলা জুড়ে বিস্তৃত জঙ্গল এবং একেবারে রাজমহল গঙ্গা-ভাগীরথী থেকে শুরু করে করতােয়া পর্যন্ত মােটামুটি উত্তর বঙ্গই পুন্ড্রবর্ধনের অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে মনে করা হয়।
১৮৭৯ সালে মহাস্তানগড় কে প্রাচীন পুন্ড্র নগরী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। 

৩. বরেন্দ্র : বরেন্দ্র বা বরেন্দ্রভূমি নামে আরেকটি প্রাচীন জনপদের কথা জানা যায়। সুভাষ মুখােপাধ্যায় তাঁর বাংলার প্রাচীন জনপদ নামকপ্ৰন্ধে লিখেছেন দিনাজপুর ও রাজশাহী জেলা এবং সম্ভবত পাবনা জেলায় , পাল আমলে দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে দিব্যোকের নেতৃত্বে কৈবর্তরা বরেন্দ্রে বিদ্রোহ করে। মহীপালকে পরাজিত ও নিহত করে তারা স্বাধীন রাজত্ব কায়েম করে। ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন, দিব্যোকের পর শুরুদোক এবং তারপর ভীম বরেন্দ্র রাজ্যের রাজা হন। 

৪. গৌড় : গৌড় বলতে কোন অঞ্চলটাকে বােঝাত তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। পাণিনির ব্যাকরণে, বাৎসায়নের কামসূত্রে এবং কোটিল্যের অর্থশাস্ত্রে গ্লৌড় রাজ্য ও তার সমৃদ্ধির কথা উল্লেখ আছে। হর্ষবর্ধনের অনুশাসন লিপি থেকে জানা যায়। যে, মৌখরি রাজ ঈশান বর্মণ গৌড়বাসীকে পরাজিত করে সমুদ্র পর্যন্ত বিতাড়িত করে ছিলেন। এতে বােঝা যায় যে, গৌড় রাজ্য সমুদ্র উপকূল থেকে খুব বেশি দূরে অবস্থিত ছিল না। “ভবিষ্য পুরাণে” গৌড়ের স্থলে দেখানাে হয়েছে আধুনিক বর্ধমানের উত্তরে, পদ্মার দক্ষিণে। ধারণা করা হয়, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও মালদহ জেলার দক্ষিণাংশ। প্রাচীনকালে গৌড় নামে পরিচিত ছিল। সপ্তম শতাব্দিতে রাজা শশাঙ্কের রাজত্বকালে মুর্শিদাবাদের নিকটবর্তী কর্ণসুবর্ণ গৌড়ের রাজধানী ছিল। পাল রাজাদের আমলে গৌড়ের নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেন রাজাদের আমলে মালদহ জেলার লক্ষ্মণাবতী গৌড় নামে পরিচিত ছিল। হিন্দু শাসনামলের শেষ দিকে সমগ্র বাংলা গৌড় ও বঙ্গ দু‌'ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মুসলিম শাসনামলের শুরুতে মালদহ জেলার লক্ষ্মণাবতী গৌড় নামে পরিচিত ছিল। 

৫. সমতট : পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার বঙ্গের প্রতিবেশী জনপদ হিসেবে সমতটের অবস্থান ছিল। চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং এর মতে, সমতট কামরূপ থেকে ২৫০-২৬০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। সমতটের ভূমি নিম্ন উর্বর ও কর্ষণযোগ্য বলে প্রচুর শস্য ফলে এবং জলবায়ু স্বাস্থ্যসম্মত। রাজধানীর পরিধি ছিল চার মাইল। মূলত সমুদ্র স্পর্শী অঞ্চল বােঝাতে সমতট শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন যে, সমুদ্র নিকটবর্তী বর্তমান কুমিল্লা ও নােয়াখালী অঞ্চল নিয়ে সমতট গঠিত হয়েছিল। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতক থেকে পৃথক রাজ্য হিসেবে সমতটের নাম খুঁজে পাওয়া যায়। সপ্তম শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত বর্তমান ত্রিপুরা রাজ্য সমতটেরই অংশ ছিল। একসময় সমতটের পশ্চিম সীমা চব্বিশ পরগণা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্ব তীর থেকে শুরু করে মেঘনার মােহনা পর্যন্ত সমুদ্র-উপকূল অঞ্চলকেই সম্ভবত সমতট বলা হতাে। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে, কুমিল্লা শহরের ১২ মাইল পশ্চিমে বড় কামতা নামক স্থানটি সপ্তম শতকে এর রাজধানী ছিল।

৬. হরিকেল : হরিকেল জনপদের অবস্থান ছিল বাংলার পূর্ব প্রান্তে। চীনা পর্যটক ইংসিং বলেছেন, হরিকেল হলাে পূর্ব ভারতের সীমায় । সপ্তম শতক থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত হরিকেল গঙ্গা সমতটের সংলগ্ন পৃথক রাজ্য ছিল। ধারণা করা । হয় যে, পূর্বে শ্রীহট্ট (সিলেট) থেকে চট্টগ্রামের অংশ বিশেষ পর্যন্ত হরিকেল জনপদ বিস্তৃত ছিল। “মঞ্জুশ্রী মূল কলা” নামক বৌদ্ধ গ্রন্থে হরিকেল, সমতট ও বঙ্গ ভিন্ন-ভিন্ন ভূখণ্ডের নাম আনুমানিক পঞ্চদশ শতাব্দির দুইখানি পুঁথিতে হরিকেল সিলেটের প্রাচীন নাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পূর্ববঙ্গের চন্দ্র রাজবংশের রাজা ত্রৈলােক্য চন্দ্রের চন্দ্রদ্বীপ অধিকারের পর। থেকেই হরিকেলকে বঙ্গের অংশ বলে ধরা হয়।

৭. চন্দ্রদ্বীপ : আরেকটি জনপদ হলাে চন্দ্রদ্বীপ। রামপাল তাম্রশাসনে ত্রৈলােকচন্দ্রের শাসনাধীন ভূখণ্ড হিসেবে গড়ে উঠেছে।এ প্রাচীন জনপদটি বালেশ্বর ও মেঘনার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ছিল। সুভাষ মুখােপাধ্যায় বাঙ্গালহ"প্রবন্ধে লিখেছেন চন্দ্রদ্বীপ মধ্যযুগের একটি নামকরা জায়গা। আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে বাকলা আর চন্দ্রদ্বীপ একই জায়গা বলে অনেক দিন আগেই সাব্যস্ত হয়েছে। চন্দ্রদ্বীপ এ অবস্থিত প্রাচীন জনপদ বাকেরগঞ্জের অংশ বিশেষ ছিল। নীহাররঞ্জন রায় এর মতে, চন্দ্রদ্বীপ ছিল বাকেরগঞ্জের অংশ বিশেষ। বর্তমান বাকেরগঞ্জ বরিশাল জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা। 

৮. রাঢ় : জৈন গ্রন্থে সর্বপ্রথম রাঢ় জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ জনপদের উত্তরতম সীমায় গঙ্গা-ভাগীরথী, পূর্ব সীমায় নদী। এর মাঝের অংশটুকু রাঢ় জনপদ নামে পরিচিত। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠশতকে মহাবীর তার কয়েকজন শিষ্য নিয়ে ধর্মপ্রচারের জন্য রাঢ় জনপদে আসছিলেন। এই জনপদের তখন রাস্তাঘাট ছিল না ; আচার আচরণের বালাই ছিল না। এখানকার লােকজন ছিল কিছুটা নিষ্ঠুর ও বর্বর প্রকৃতির। তারা এসব সন্ন্যাসীর পিছনে কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিল। আচারঙ্গ সূত্রে পশ্চিমবঙ্গবাসীর বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার উল্লেখ আছে। তখন রাঢ় জনপদ দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। যথা : সূহ্মভূমি ও বজ্রভূমি। অজয় নদ ছিল রাঢ়ের দু'ভাগের মধ্যে সীমারেখা। 

ক. সূহ্মভূমি : গঙ্গা-ভাগীরথীর পশ্চিম তীরবর্তী দক্ষিণের ভূখণ্ড সুহ্মভূমি নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে বর্ধমান জেলার দক্ষিণাংশ, হুগলির বহুলাংশে এবং হাওড়া জেলা নিয়ে প্রাচীন জনপদ গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে এই অঞ্চল দক্ষিণ রাঢ় নামে পরিচিত হয়। শ্রীধরাচার্যের “নায়কান্দালি" নামক গ্রন্থে দক্ষিণ রাঢ়ের উল্লেখ আছে। 

খ, বজ্রভূমি অজয় নদের উত্তর দিকে রাঢ়ের অন্তর্গত ভূ-ভাগই বজভূমি বা উত্তর রাঢ় নামে পরিচিত ছিল। বর্তমান - মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহকুমা, সমগ্র বীরভূম জেলা (সাওতাল ভূমিসহ) এবং বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমা উওর রাঢ়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। 

রাঢ়ের রাজধানী কোটিবর্ষে ছিল। ধারণা করা যাচ্ছে যে, বর্তমান দিনাজপুর জেলার আধুনিক বানগ্রাম নামক গ্রাম প্রাচীন রাঢ়ের রাজধানী। কোটি বর্ষ জৈন গ্রন্থ আচারঙ্গ সূত্রে কোটি বর্ষকে রাঢ়ের অন্তর্গত বলা হয়েছে। এতে অনুমান করা যায়। . কেৰা এক সময়ে উত্তর রাঢ়ের উত্তর সীমানা গঙ্গা নদী পার হয়ে আরও উত্তরে বিস্তৃত ছিল। 

৯. সূহ্ম : সর্বপ্রথম পতঞ্জলির মহাকাব্যে সূহ্ম জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন বৌদ্ধ ও জৈন শাস্ত্রেও সূহ্মের উল্লেখ আছে। মহাভারতে উল্লেখ আছে ভীম তাঁর পূর্বদেশ বিজয়াভিযানে বঙ্গদের পরাজিত করেন এবং সমুদ্রোপকূলবর্তী জনগােষ্ঠীকে পদানত করেন। এ থেকে বােঝা যায় সূক্ষের অবস্থিতি সমুদ্র উপকূল ও তাম্রলিপ্তির কাছাকাছি ছিল। কালিদাসের রঘুবংশ কাব্যে রঘুর দিগ্বিজয় প্রসঙ্গে সমুদ্র উপকূলে “তালিবন শ্যামােপকণ্ঠে” সূহ্মদের পরাজয়ের কথা উল্লেখ আছে এবং ধারণা করা হয় রঘু গঙ্গা ভাগীরথীর পশ্চিম তীর ধরে দক্ষিণাভিমুখে যাত্রা করে সমুদ্রের উপকূলে সূহ্মদেশে পদার্পণ করেছিলেন। বৃহৎ সংহিতায়, সূহ্মদেশের অবস্থিতি বঙ্গ ও কলিঙ্গের মধ্যবর্তী ছিল বলে উল্লেখ আছে। ত্রয়ােদশ শতকের ধােয়ীর ‘পবনদূত' কাব্যে সূহ্মদেশের বিবরণ পাওয়া যায়। সুতরাং সূহ্মদেশ বলতে পশ্চিম বঙ্গের দক্ষিণাঞ্চলকে বােঝাত এবং তাম্রলিপ্তি সূহ্মেরই অংশ বিশেষ। নীহাররঞ্জন রায় এর মতে বর্তমান বর্ধমানের দক্ষিণাংশ, হুগলীর বহুলাংশ,বীরভূম এবং হাওড়া জেলাই প্রাচীন সূহ্ম জনপদ। 

১০. তাম্রলিপ্তি : তাম্রলিপ্তি ছিল বাংলার একটি প্রসিদ্ধ বন্দর। মহাভারতে ভীমের দিগ্বিজয় প্রসঙ্গে তাম্রলিপ্তির প্রথমে উল্লেখ পাওয়া যায়। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার এর মতে “মহাভারতে তাম্রলিপ্তিকে সূহ্মদেশ থেকে আলাদা করে দেখানাে আছে। তাঁর জৈন প্রজ্ঞাপারমিতা এবং দশ কুমারচরিত্রে একে সূহ্মের অন্তর্ভুক্ত দেখানাে হয়েছে এবং তাম্রলিপ্তিকে সূহ্মের রাজধানী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বােঝা যায় যে, তাম্রলিপ্তি ছিল সূহ্ম বা দক্ষিণ রাঢ়ের রাজধানী। বর্তমান মেদিনীপুর জেলার তমলুক অঞ্চলই ছিল তাম্রলিপ্তি জনপদের কেন্দ্রস্থল পেরিপ্লাস নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে। ইৎসিং এর বিবরণে নৌবাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে তাম্রলিপ্তির বর্ণনা আছে। 

১১. বিক্রমপুর : দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার একটি বিখ্যাত নগরীর নাম বিক্রমপুর। রাজাদের তাম্রলিপিসমূহে বিক্রমপুর “জয় স্কন্ধাবার হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। সেই যুগে যে ভূখণ্ড, বরেন্দ্রী ছিল তা এখনও মুন্সিগঞ্জে বিদ্যমান। সুতরাং মুন্সিগঞ্জ শহরের অদূরে রামপালের কাছে বল্লালবাড়ি করা হয়। রামপালের কাছে বল্লালবাড়ির ধ্বংসাবশেষ প্রাচীন বিক্রমপুরের নিদর্শন।

১২. সপ্তগাঁও : হুগলি জেলার সপ্তগ্রাম দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার বন্দর রাবি খ্যাতি লাভ করেছিল। বিপ্রদাসের মনসামঙ্গলে বেশ কয়েক জায়গায় সপ্তগ্রামের নাম উল্লেখ আছে। ভাগীরথী থেকে যমুনা সরস্বতী প্রবাহ দুটি বেরিয়ে যাওয়ার স্থান থেকে ত্রিবেনী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল সপ্তগ্রাম শহর। ১২৯৮ খ্রিস্টািেত্রবেনীতে জাফর খান্য গাজীর মসজিদের শিলালিপির উল্লেখ থেকে প্রমাণিত হয় যে, সাতগাঁও ত্রিবেনীতে মুসলমানদের আধিপত্য বিস্তার লাভ করে ছিল। ইলিয়াস শাহ কর্তৃক সমগ্র বাংলার একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার উল্লেখযােগ্য নগর ছিল সাতগাঁও। সম্রাট আকবর এর রাজত্বকালে সুবাহ বাংলার একটি সরকার ছিল সাতগাঁও। 

১৩. পুস্করণ : রামায়ণ ও মহাভারতে পুস্করণ নামের উল্লেখ আছে। এ নগরটি বাঁকুড়া জেলার দমােদর নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ছিল বলে ধারণা করা হয়। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের শুশুনিয়া লিপিতে মহারাজ চন্দ্রবর্মার রাজ্যকেন্দ্র হিসেবে পুস্করণ এর নামে উল্লেখ আছে। 

১৪. কর্ণসুবর্ণ : পশ্চিম বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার একটি সুপ্রসিদ্ধ নগরের নাম কর্ণসুবর্ণ । বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা শশাঙ্কের রাজধানী হিসেবে কর্ণসুবর্ণ খ্যাতি লাভ করে। সপ্তম শতকে এই নগরের উপকণ্ঠে বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতির রক্তমৃত্তিকা বিহার অবস্থিত ছিল। বর্তমানের মুর্শিদাবাদ শহরের দক্ষিণে ভাগীরথী তীরবর্তী “রাঙ্গাঢ” এবং “কানসােনা” যথাক্রমে “রক্তমৃত্তিকা বিহার ও কর্ণসুবর্ণের স্মৃতির উৎকৃষ্ট নিদর্শন।

১৫. বর্ধমান : নীহাররঞ্জন রায় তার বাঙালির ইতিহাস গ্রন্থে বলেন, “প্রাচীন ধর্মীয় সাহিত্যে বর্ধমান নগরীর খ্যাতির পরিচয় পাওয়া যায়। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দি বর্ধমান যে প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল তার বহুলিপি প্রমাণ রয়েছে।” ভাগারথী নদীর পশ্চিমে প্রাচীন বাংলার বর্ধমান ভুক্তি বলে যে প্রশাসনিক বিভাগ ছিল কেন্দ্র হয়তাে বর্ধমান শহরেই ছিল। 

১৬. পাহাড়পুর : পাহাড়পুর, বর্তমান নওগাঁ জেলায় অবস্থিত। পাল বংশীয় রাজা এখানে বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে সােমপুর বিহার নির্মাণ করেন। এই বিহারটির ধ্বংসাবশেষ নওগাঁ জেলার পাহাড়পুরে আবিস্কৃত হয়েছে সােমপুর বিহার । সমগ্র উপমহাদেশর সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ বিহার। পার্শ্ববর্তী গ্রাম ও বিহার সম্ভবত এখনও “সােমপুর” নামের স্মৃতি করেছে। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে পাহাড়পুরে পাল রাজাদের রাজধানী স্থাপিত হয়েছিল। 

১৭. মহাস্থানগড় : বাংলাদেশের বর্তমান বগুড়া জেলা শহর থেকে ১১ কি.মি. উত্তরে মহাস্থান গড় অবস্থিত। এর পূর্ব দিক দিয়ে করতােয়া নদী প্রবাহিত। মহাস্থানগড়ের দৈর্ঘ্য ৫,০০০ ফুট এবং প্রস্থ ৪,৫০০ ফুট। এটি সমতল ভূমি থেকে প্রায় ১৫ ফুট উচুতে অবস্থিত। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত মৌর্য গুপ্ত, পাল ছাড়াও আরাে কিছু হিন্দু সামন্ত রাজবংশের রাজধানী এখানে অবস্থিত ছিল।

পরিশেষে বলা যায় যে, প্রাচীন যুগে মুসলমান শাসনামলের পূর্ব পর্যন্ত পুন্ড্র, গৌড় ও বঙ্গ এই তিনটি জনপদ প্রায় সমগ্র | বাংলার সমর্থক হয়ে ওঠে। তন্মধ্যে পুন্ড্র যেন গৌড়ের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল। সপ্তম শতকের পর থেকেই বাংলার বাইরে বাংলা, গৌড় বা বঙ্গ নামে আখ্যায়িত হয়েছে। মুসলমান শাসনামলে প্রাথমিক পর্যায়ে লখনৌতি এবং পরে সাতগাঁও এর রাজনৈতিক সত্তা গড়ে ওঠে। শামস উদ্দিন ইলিয়াস শাহ এর শাসনামলে এই তিনটি সত্তার উৎপত্তি হয়। মূলত বঙ্গ একে “বাংলা” নামের উৎপত্তি হয়েছে। মুঘল শাসনামলে “সুবাহ-ই বাঙ্গালহর মাধ্যমে সব ঘটে। 

বাংলার বিভিন্ন অংশ তখন গৌড়, হরিকেল, সমতট, বরেন্দ্র এরকম প্রায় ১৬টি জনপদে বিভক্ত ছিল। বাংলার এই প্রাচীন জনপদের সীমা ও বিস্ততি সঠিকভাবে নির্ণয় করা অসম্ভব। কেননা বিভিন্ন সময়ে এসব জনপদের হ্রাস বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলা জনপদগুলাের মধ্যে প্রাচীনতম হলাে পুন্ড্র।
 

প্রাচীন বাংলার জনপদসমূহ প্রাচীন জনপদসমূহের বর্তমান অবস্থান

পুন্ড্র : বৃহত্তর বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার অংশ বিশেষ। 

বরেন্দ্র : বগুড়া, পাবনা, রাজশাহী বিভাগের উত্তর পশ্চিমাংশ, রংপুর ও দিনাজপুরের কিছু অংশ। 

বঙ্গ : কুষ্টিয়া, যশাের, নদীয়া, শান্তিপুর, ঢাকা, ফরিদপুর এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ। 

গৌড় : মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বর্ধমান ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ । 

সমতট : বৃহত্তর কুমিল্লা ও নােয়াখালী অঞ্চল। 

রাঢ় : পশ্চিম বাংলার দক্ষিণাঞ্চল (বর্ধমান জেলা)। 

হরিকেল : চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা, সিলেট। 

চন্দ্রদ্বীপ : বরিশাল। 

বিক্রমপুর : মুন্সীগঞ্জ জেলা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল। 

সপ্তগাঁও : খুলনা এবং সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চল। 

কামরূপ : রংপুর, জলপাইগুড়ি, আসামের কামরূপ জেলা। 

তাম্রলিপ্তি : মেদিনীপুর জেলা। 

আরাকান : কক্সবাজার, মায়ানমারের কিছু অংশ, কর্ণফুলি নদীর দক্ষিণাঅঞ্চল। 

সূহ্ম : গঙ্গা-ভাগীরথীর পশ্চিম তীরের দক্ষিণ ভূভাগ, আধুনিক মতে বর্ধমানের দক্ষিণাংশে, হুগলির বৃহদাংশ, হাওড়া এবং বীরভূম জেলা নিয়ে সূহ্ম জনপদের অবস্থান ছিল।

Post a Comment

If you have any doubts, please let me know.

Previous Post Next Post